
: ড. এ কে আবদুল মোমেন এমপি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাবার পর বলেছিলেন, তিনি অর্থনৈতিক কূটনীতিতে অগ্রাধিকার দেবেন। অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন, ২০৪০ সালের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া, রোহিঙ্গাসংকট সমাধান করাসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেশ কিছু লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবেন।
দায়িত্ব গ্রহনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। কখনও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে কখনওবা একা। তিনি যখন যেখানে গেছেন সেখানেই তিনটি বিষয় তোলে ধরেছেন। ১.প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতেৃত্বে বাংলাদেশ কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ২.রোহিঙ্গাসংকট ৩. বাংলাদেশে বিনিয়োগ।
জাতিসংঘের ৭৪তম অধিবেশনে যোগদানের জন্যে গত ২০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার অপরাহ্নে নিউইর্য়কের জেএফকে এয়ারপোর্টে অবতরণ করে উপস্থিত গণমাধ্যমকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরাতো ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। মিয়ানমারের রাখাইনসহ অন্য এলাকাতে আরো ৬ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছেন। তারাও জিম্মিদশায় আছেন। তাদের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা সভ্য সমাজকে জানাতে হবে।
জাতিসংঘের ৭৪তম অধিবেশ চলাকালীন সময় তিনি সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত সভাগুলোতে বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলেন। তিনি স্পষ্টভাষায় বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মায়ানমারের সৃষ্টি সুতরাং সমাধান তাদেরকেই করতে হবে। তাঁর এই বক্তব্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সমর্থন করে।
‘গ্লোবাল সেন্টার ফর দ্য রেসপন্সিবিলিটি টু দ্য ইউএন’র সহায়তায় বাংলাদেশ মিশনের উদ্যোগে ২৫ সেপ্টেম্বর বুধবার সন্ধ্যায় নিউইর্য়কে অনুষ্ঠিত হয় ‘রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পরিক্রমা’ শীর্ষক এক সেমিনার। এই সেমিনারে কো-হোস্ট সংস্থার

নির্বাহী পরিচালক ড. সাইমন এডামের সঞ্চালনায় প্যানেলিস্ট হিসেবে আরো বক্তব্য রাখেন গ্লোবাল জাস্টিস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট আকিলা রাধাকৃষ্ণান এবং গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবুবকর এম তাম্বাডো।
এই সেমিনারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘পরপর দু’দফা তারা (মিয়ানমার) সসম্মানে রোহিঙ্গাদের নিজ বসতভিটায় প্রত্যাবর্তনের অঙ্গিকার ভঙ্গ করেছেন। ড. মোমেন গত দু’বছরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে শক্তিশালী ভ’মিকায় থাকলেও বাস্তবে তার পরিসমাপ্তি ঘটেনি। ড. মোমেন বলেন, ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার ভরনপোষণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ-সহায়তা সবচেয়ে বেশী। আরো কটি দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের পাশে থাকলেও প্রাণের ভয়ে বাস্তুভিটা ত্যাগে বাধ্য রোহিঙ্গাদের সম্মানের সাথে নাগরিকের অধিকারসহ নিজ বসতভিটায় ফিরে যাবার পরিবেশ তৈরীতে সক্ষম হয়নি।’
ড. মোমেনের অব্যাহত প্রচেষ্টায় মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র প্রদানের সিদ্ধান্ত জানায়। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সাইড লাইনে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে অনুষ্ঠিত হয় । এতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে যৌথ কমিশন করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হ
অক্টোবরের প্রথম সাপ্তাহে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া সামিটে প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাজিমাত করেছেন। ইন্ডিয়া সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সুযোগ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় নতুন ডিপ্লোম্যাসির ম্যাজিকে বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ ও সৌহার্দ্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী ৪ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সময়পোযোগি এই প্রস্তাবে কূটনীতিকদের প্রশংসায় সিক্ত হোন তারা।

২৫ ও ২৬ অক্টোবর আজারবাইজানের রাজধানী বাকুর কংগ্রেস সেন্টারে ন্যাম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এমপি ইউরোপ সফরে বের হোন।
অত্যন্ত ফলপ্রসু এই সফরে তিনি রোহিঙ্গা সংকট, বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং শেখ হাসিনার নতেৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন এই তিনটি বিষয় তোলে ধরেন।

১৭ অক্টোবর বার্লিনে জার্মান ফেডারাল অ্যাসোসিয়েশন ফর ইকোনমিক ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড ফরেন ট্রেড (বিডব্লিউএ) সম্মেলনে ভাষণ দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এসময় জার্মান ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য তিনি আমন্ত্রণ জানান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জার্মান ব্যবসায়ীদের জানান, বাংলাদেশে উন্নত ব্যবসা বান্ধব নীতি ও পরিবেশ রয়েছে। তিনি বাংলাদেশের অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উত্পাদন খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। চট্রগ্রামের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে তাদেরকে মার্সিডিজ, বিএমডাব্লু এবং ভক্সওয়াগেনের মতো জার্মান গাড়ি নির্মাণ করার কথাও বলেন।
১৮ অক্টোবর জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাশয়ের সাথে বৈঠক করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এই বৈঠকে তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আর্ন্তজাতিকভাবে আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহনের আহ্বান জানান।
বৈঠকে ড. মোমেন জানান, গত মাসে ৭৪তম ইউএনজিএতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত চারটি বিষয় উল্লেখ করেন এবং মিয়ানমার সরকার যাতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে পারে সেজন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জার্মান সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। একটি টেকসই পদ্ধতিতে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি সংঘটিত নৃশংসতার জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তিনি জার্মানির সমর্থনও চান।
২১ অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ফ্রান্স অর্থনৈতিক ফোরামে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বাংলাদেশের অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আইসিটি খাতে ফরাসী বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
এর আগের দিন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ফরাসী বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দায়িত্বে থাকা ফ্রান্সের ইউরোপ ও বিদেশ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব জেন ব্যাপটিস্ট লেমনয়ের সাথে বৈঠক করেছেন। সভায় ড. মোমেন গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্জনসমূহ তুলে ধরে এবং বাংলাদেশে ফরাসী বিনিয়োগের আহ্বান জানান। এই বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং রোহিঙ্গাদের রাখাইনে রাজ্যে তাদের স্বদেশে শীঘ্রই স্বদেশ প্রত্যাবাসন করার জন্য মিয়ানমারের উপর চাপ আরোপের জন্য ফ্রান্সসহ ইইউ সদস্যদের অনুরোধ করেন।

২৩ অক্টোবর আজারবাইজানের বাকুতে ১৮ তম ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতিমূলক সভায় রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে ন্যাম মন্ত্রীদের সর্তক করে বলেন, ‘আমরা যদি রোহিঙ্গা সঙ্কটের পুনরাবৃত্তি এবং মানবিক বির্পযয় দেখতে না চাই তবে আমাদের অবশ্যই অপরাধীদের জবাবদিহির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরেও মিয়ানমার এখন পর্যন্ত কোন রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়নি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন ন্যামের গুরুত্ব অনুধাবন করে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে তাঁর আলজিয়ার্স শীর্ষ সম্মেলনে এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের ইউরোপ সফরকে অনেকেই ইউরোপ জয় বলে অভিহিত করেছেন। এই সফরে তিনি বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ, রোহিঙ্গা সংকট এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অত্যন্ত বলিষ্টভাবে তোলে ধরেছেন।
যার ফলে ইউরোপের ব্যবসায়ীর বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তারা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে অবস্থান করার অঙ্গিকার ব্যক্ত করেছেন।
অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন হয়েছে, সেটাকে বিশ্ব নেতারা ‘মিরাকল’ বলেও অভিহিত করেছেন।আর এতে করে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও সুদৃঢ় হয়েছ