
মানুষ যখন বিভিন্ন প্রতিকূলের কারণে নেশায় জড়িয়ে পড়ে, তখন কি সে চিন্তা করে এর শেষ পরিণাম কী? সামনে তার কত অশান্তি ভোগ করতে হবে। মাদকাসক্তি সামান্য তৃপ্তি আর শান্তি, কিন্তু এ শান্তি কি প্রকৃত শান্তি? এ তৃপ্তি কি প্রকৃত তৃপ্তি? কখনও নয়। কিন্তু কেন এ কৃত্রিম শান্তি আর তৃপ্তির পেছনে সবাই? আসুন দেখি নিই বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির কুফল।
১. ধর্মীয় কুফল
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তার ইবাদত ও তাকে স্মরণের জন্য। কিন্তু তার এ মহান উদ্দেশ্য অর্জনে প্রধান বাধাদানকারী হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদকাসক্তি। মাদকাসক্তি মানুষকে নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদত, নেক কাজ তথা সর্বক্ষণ আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে রাখে। লিপ্ত করে পাপাচার, অশ্লীলতা, হাইজ্যাক, পতিতাবৃত্তি, স্মাগলিং ও মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের মতো সমাজের জঘন্যতম বিকৃত কাজে।
২. দৈহিক কুফল
মাদকাসক্তি মানবদেহে অত্যন্ত মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এটি সেবনের ফলে হজমশক্তি লোপ পায়, ক্ষুধামান্দ্য, পাকস্থলীতে ঘা, স্নায়ু দুর্বলতা, হৃৎপি-ের দুর্বলতা, লিভার ও কিডনি নষ্ট হয়ে যায়। শিরা-ধমনির শক্তি ক্ষয় হয় এবং অকালে বার্ধক্য আসে। এসব ছাড়া আরও অনেক দৈহিক কুফল বয়ে আনে এটি।
৩. মানসিক কুফল
মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও মস্তিষ্কের ওপর মাদকাসক্তির প্রতিক্রিয়া আরও মারাত্মক ও ক্ষতিকর। এতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে মস্তিষ্কের উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তির স্তর। ব্যক্তি হয়ে পড়ে মাতাল ও লজ্জাহীন। একপর্যায়ে চেতনাশক্তি হারিয়ে ফেলে।
৪. সামাজিক কুফল
মাদকাসক্তি শুধু মানবতা ও নৈতিকতাবিরোধী কার্যকলাপের দিকেই উদ্বুদ্ধ করে না বরং মানুষকে যাবতীয় মন্দ ও ঘৃণ্যতর কাজের দিকেও ধাবিত করে। আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) এর ভাষায়, ‘মাদকাসক্তি সব অপকর্ম ও অশ্লীলতার উৎস।’ দুঃখজনক হলেও সত্য, এ সর্বনাশা অভিশাপের শিকার সমাজের সর্বস্তরের লোক।
৫. অর্থনৈতিক কুফল
অর্থনৈতিক দিক দিয়েও মাদকাসক্তি বিপুল ক্ষতি করে থাকে। নেশার তাড়নায় সুরাসক্ত ব্যক্তি নিজের সর্বস্ব বিক্রি করেও ক্ষান্ত হয় না। পরিবার-পরিজন থেকে শুরু করে সমাজের আরও দশজনের টাকা-পয়সা লুটপাট করে জাতীয় জীবনে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে টেনে আনে মারাত্মক ধস। এমনিভাবে মাদকাসক্তি প্রাচুর্যের অধিকারীকেও নিঃস্ব ও পথের ভিখারি করে তোলে। বিড়ম্বনা, হতাশা ও দুর্ভোগ তখন তার নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিরোধ
পৃথিবীতে কোনো ধর্মই মাদকদ্রব্য ব্যবহার অনুমদিত করেনি। আর ইসলামের দৃষ্টিতে সব ধরনের মাদকদ্রব্যের ব্যবহার একটি জঘন্য ধর্মীয় ও সামাজিক অপরাধ। মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘মানুষ তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, বলো দুইটিই বড় পাপের কাজ এবং মানুষের জন্য তাতে তুচ্ছ উপকার থাকলেও উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি।’ (সূরা বাকারা : ২৯৯)। অপর এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিলেন, ‘হে মোমিনরা! নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা নামাজের নিকটবর্তী হয়ো না। যতক্ষণ না তোমরা যা বল, তা বুঝতে পার।’ (সূরা নিসা : ৪৩)।
এ ব্যাপারে প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘নেশাজাতীয় যে কোনো দ্রব্য মদের অন্তর্ভুক্ত। আর যাবতীয় মদই হারাম।’ (বোখারি)। প্রিয়নবী (সা.) আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি মদপান করে, যে মদপান করায়, মদের ক্রয় ও বিক্রয়কারী, প্রস্তুতকারী, আর যে প্রস্তুত করায়, যে ব্যক্তি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করে, যার জন্য বহন করা হয় এবং যারা মদের লাভ্যাংশ ভোগ করেÑ এদের সবার প্রতি আল্লাহ তায়ালার অভিশাপ রয়েছে।’ (মুসলিম)।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অভিমত
অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের অভিমত হচ্ছে, নেশার অভ্যস্থ মানুষের বোধশক্তিকেও দুর্বল করে দেয়। নেশার প্রভাব চৈতন্য ফিরে পাওয়ার পরও ক্রিয়াশীল বাকি থাকে। অনেক সময় মানুষ এতে পাগলও হতে পারে। চিকিৎসাবিদদের সবাই একমত যে, শরাব কখনও শরীরের অংশে পরিণত হয় না, শরীরে রক্তও সৃষ্টি হয় না। তবে রক্তের মধ্যে একটা সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়মাত্র। ফলে শক্তির সামান্য আধিক্য অনুভূত হয়। কিন্তু হঠাৎ রক্তের এ উত্তেজনা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফ্রান্সের বিশিষ্ট প-িত হেনরি তার গ্রন্থে লিখেছেন, প্রাচ্যবাসীকে উৎখাত করার জন্য সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র এবং মুসলমানদের খতম করার জন্য নির্মিত দুধারী তলোয়ার ছিল এ শরাব। ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞ ব্যান্টাম লেখেন, ইসলামী শরিয়তের অসংখ্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য যে মদ্যপান নিষিদ্ধ, সত্যি শান্তিময় এ এক ধর্ম।
আমাদের করণীয়
বর্তমানে আমাদের দেশে মাদকাসক্তির প্রবণতা যে হারে বেড়ে চলছে, তা দমনের জন্য কঠোর কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া না হলে পুরো জাতি ধ্বংসলীলার শিকারে পরিণত হতে বাধ্য। কোরআনি তথা ইসলামী নীতি অবলম্বন করে মাদকাসক্তির করাল গ্রাস থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর পক্ষ থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
প্রস্তুতকারকের ভূমিকা
প্রথম এ দায়িত্ব বর্তায় যারা মাদকদ্রব্য প্রস্তুত, প্রচলন ও সরবরাহের কাজে জড়িত তাদের ওপর। তাদের জাতীয় স্বার্থে এ ঘৃণ্য কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। দেশ ও জাতির ক্ষতি সাধন করে নিজেদের আর্থিক ফায়দা লুটার মানসিকতা পরিবর্তন করা দরকার।
পারিবারিক দায়িত্ব
দ্বিতীয়ত, পরিবারপ্রধানদের উচিত, তারা যেন নিজেদের সন্তানসন্ততিকে মাদকদ্রব্যের ক্ষতি সম্পর্কে উত্তম প্রশিক্ষণ দান করেন এবং সতর্ক থাকেন যাতে তারা এ কু-অভ্যাসে কোনো মতেই লিপ্ত হতে না পারে। সর্বোপরি সন্তানদের যথাযথ ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে মাদকাসক্তির ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে
ইমাম ও আলেমদের ভূমিকা
মসজিদের ইমামরা মাদকদ্রব্যের ক্ষতির দিক সম্পর্কে ওয়াজ-নসিহত করার মাধ্যমেও এর বিস্তৃতি রোধ করতে পারেন। আলেমরা জুমার খুতবায় এর ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে আলোচনা করতে পারেন। এভাবে সেমিনার, আলোচনা সভা করে মাদকাসক্তি রোধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরতে পারেন।
শিক্ষকদের ভূমিকা
এক্ষেত্রে শিক্ষকরা অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। শিক্ষকদের সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, শিক্ষার্থীরা যেন এ মন্দকাজে জড়িয়ে না যায়। একজন শিক্ষক জানেন কীভাবে তার ছাত্রকে বিভিন্ন কু-অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে হয়। একজন শিক্ষক পারেন আদর্শ এক ছাত্র উপহার দিতে।
সমাজ নেতাদের কর্তব্য
মাদকদ্রব্যে প্রসার রোধকল্পে সমাজ নেতাদের যথেষ্ট ভূমিকা চাই। কোনো পাড়ার সরদার বা সমাজ নেতা যদি মাদকদ্রব্যের প্রসার রোধের দৃঢ়সংকল্প নিয়ে প্রচেষ্টা চালান, তাহলে সে পাড়া বা সমাজে কখনও মাদকদ্রব্য ব্যবহারের প্রসার ঘটতে পারে না।
আইন প্রণয়ন সংস্থার দায়িত্ব
মাদকাসক্তি রোধে আইন প্রণয়ন সংস্থা অনেক বড় দায়িত্ব রাখে। যারা মাদকদ্রব্য প্রস্তুত করে প্রচার করে সবাইকে কঠোর শাস্তি দেয়া। আর এদের বিরুদ্ধে কঠিন বিধান জারি করা। তাহলেই ধীরে ধীরে মাদকাসক্ত নির্মূল হবে। এভাবেই একটি সুন্দর সমাজ দিতে পারবে আইন সংস্থা।









